1. multicare.net@gmail.com : সময়ের পথ :
শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন

দেনমোহর বনাম যৌতুক

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০২২
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

লেখক, কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকীঃ

শান্তি, সাম্য, অধিকার প্রতিষ্টাই ইসলাম ধর্মের মূল দর্শন। কোন ধর্মই অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন কে সাপোর্ট করে না। ধর্মের মুখোশে অধর্ম চর্চা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

এজন্য বিদ্রোহী কবি বলেছেন, “অসত্যের কাছে কভু নত নাহি হবে শির, ভয়ে কাপে কা-পুরুষ লড়ে যায় বীর।” যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। যৌতুক নামের কুপ্রথা নিঃসন্দেহে গর্হিত ও অমার্জিত কাজ। যৌতুক তথা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন পারস্পারিক সম্প্রীতি নষ্ট করে, পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা একটি জগন্য অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের নিন্দা ও অভিসম্পাত করেছেন। এজন্য নবীজি দ. বলেছেন, “আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না”। বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলে। স্বামী স্ত্রী একে অপরের দাস-দাসী বা চাকর-চাকরাণী নয় বরঞ্চ সম্পূরক। নর-নারী কে অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বাঁচাতে ইসলাম ধর্ম বিবাহ প্রথা চালু করেছেন। দাম্পত্যজীবন গড়ার লক্ষ্যে নর-নারীর যুগলবন্দি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাংলায় ‘বিবাহ’ বা ‘বিয়ে’, উর্দু ও ফারসি ভাষায় ‘শাদি’, আরবিতে বলা হয় ‘নিকাহ’। তম্মধ্যে দেনমোহর খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেনমোহর ভিক্ষা নয় বরঞ্চ নারীর অধিকার। দেনমোহর হলো

বিবাহের সময় কনের দাবিকৃত অর্থ বা সম্পদ, যা বর বা বরের পরিবার কনেকে প্রদান করে। মোহরানার প্রদানের মাধ্যমেই বিয়ে বৈধ হয়। ইসলামে মোহরানার সর্বনিম্ম পরিমাণ উল্লেখ আছে তবে সর্বোচ্চ পরিমাণ উল্লেখ নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেছেন, “তোমরা স্বতঃস্ফূতভাবে স্ত্রীকে মোহর দাও।” কাবিন তথা মোহরানার সংখ্যা অভিভাবক কর্তৃক নির্ধারণ অবাঞ্ছনীয় বরঞ্চ কন্যা কর্তৃক নির্ধারণ বাঞ্ছনীয়। দুটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করে দেনমোহর নির্ধারণ করতে হয়। মোহরানা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে স্ত্রীর মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে এবং মোহরানা পরিশোধে স্বামীর সক্ষমতা থাকে। বিবাহ শুদ্ধের জন্য মোহরানা পরিশোধ শর্ত। মোহরানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিবাহ অশুদ্ধ হবে। বিবাহ অশুদ্ধ হলে উভয়ের মেলামেশা অনৈতিক পর্যায়ে চলে যাবে। এ অবস্থায় সন্তানসন্ততি জন্ম নিলে জারজ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে। কারণ স্বামী মোহরানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তির মুখামুখী হবেন। এবং অতিরিক্ত মোহরানা নির্ধারণে যে বা যারা সহায়ক ভূমিকা রাখবে তারাও দুনিয়া ও আখেরাতে অপদস্থ ও লাঞ্চিত হবেন। দুটি যুগলজীবন; দুটি পরিবার কে একীভূত করে থাকে। বর্তমান সময়ে মোহরানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া খুবই দৃষ্টিকটু। মোহরানা দিয়ে কন্যা কে কেনা যায় না কারণ ইসলামী শাস্ত্রের ভাষ্যানুযায়ী মোহরানা প্রদানের মাধ্যমে স্ত্রীকে ভোগ করার অধিকার মাত্র। স্ত্রী হচ্ছে স্বামীর কাছে আমানত স্বরূপ। আমানত খেয়ানতকারী জাহান্নামের নিম্মস্তরে অবস্থান করবে। স্ত্রীর ভরণপোষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সমাদর করা স্বামীর একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। স্ত্রীর সাথে অহেতুক ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি করা যাবে না। স্বামীকে যেভাবে স্ত্রীর অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করতে হয় অনুরূপে স্ত্রীকে ও স্বামীর অধিকারে প্রতি যত্নশীল হতে হবে। স্ত্রীকে স্বামীর আদেশ, উপদেশ ও অনুরোধের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। কোনভাবেই স্বামীর অবাধ্য হওয়া যাবেনা। স্বামীর আদেশ-নিষেধ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দ. এর নাফরমানির দিকে ধাবিত হলে তা পালন বর্জনীয়। সাংসারিব জীবনে দুইজনের মতামত, আলোচনার প্রাধান্য থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্ত্রী ক্রয়কৃত দাসী নয়। বরং জীবন সঙ্গিনী/অর্ধাঙ্গিনী । এজন্য কবি নজরুল বলেছেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” হৈমন্তী গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ।” দুটি উক্তির মাঝে হাজারো প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে, নিশ্চয়ই জ্ঞানীরা তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ/মনোমালিন্য হলেই নিজেরাই তা সমাধানের চেষ্টা করবে। নিজেরাই সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে দুই পরিবার তা সমাধান করবে। তারপরও বিষয়টির সুরাহা না হলে কিংবা স্বামী-স্ত্রী দুইজন দুই মেরুতে অবস্থান করলে; দুই পরিবারের ৭/৮ জন মুরব্বি বিষয়টি সমাধান করবে। কথা কাটাকাটি, তর্কাতর্কি, ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, হাতাহাতি, মামলা-হামলা ও অমার্জিত বাক্যালাপ সুখ বয়ে আনে না। বরং দূরত্ব বাড়ায়, আন্তরিকতা কমায়, হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি করে। সাংসারিক জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলে। বিভিন্ন কারণে সংসারে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। তন্মধ্যে যৌতুক অন্যতম। মেয়ের পক্ষ হতে (নগদ টাকা,ফার্নিচার ইত্যাদী) কিংবা ছেলের পক্ষ হতে (অতিরিক্ত দেনমোহর) শরীয়ত বহির্ভূত কোন কিছু জোরপূর্বক আদায় করা হলো যৌতুক। বর্তমান সময়ে ইভটিজিং ও ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে ছেলে-মেয়ের বিয়ে সম্পাদন হচ্ছে না। হয়ত পারিবারিক কারণে কিংবা আর্থিক কারণে। আর্থিক কারণ বলতে বুঝায়, একটি নিম্নবিত্ত/ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বিবাহ করতে গেলে কমপক্ষে ৫/৬ লাখ দেনমোহর দিতে হয়। দেখা যায়, স্থাবর, অস্থাবর সম্পদের সামষ্টিক মূল্য ৫/৬ লাখ টাকা হয় না। অনেকেই ৫/৬ লাখ টাকা একসাথে জীবনেও চোখে দেখে নাই। কিন্তু উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য ৫/১০ লাখ টাকা কিছুই না। বিকৃত রুচিশীল অর্থলোভী কিছু পরিবার ছেলে-মেয়ে কে বাজারের পণ্য বানিয়ে বাজারজাত করার জন্য উকিলের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। অনেকেই সামাজিক স্ট্যাটাস এর জন্য দেনমোহর বেশি দাবি করে। অনেকেই দেনমোহর বেশি নির্ধারণ করে স্বামীকে জিম্মি করে রাখার জন্য। তারা মনে করে বিবাহবিচ্ছেদের পর ছেলের পরিবার ৫০ লাখ টাকা কখনো দিতে পারবে না। এ কারণে মেয়ে সুখে থাকবে, কখনো ডিভোর্স হবে না। অনেকেই বিত্তশালী/সম্পদশালীর কাছে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগলপারা। দেনমোহরের উপর ডিপেন্ড করে মেয়ে বিয়ে দেওয়া য়ায় না; কারণ বিবাহবিচ্ছেদের পর দেনমোহর পরিশোধ করা যায়। কিন্তু একটি মেয়ের সুন্দর জীবন ফিরে দেওয়া যায় না। নেশাখোর, বদমাইশ, নারীলোভী, অত্যাচারী, অমানুষ, অকৃতজ্ঞ,অর্থ-লোভী, সুদখোর, পরহিংসাকারী, আত্মঅহংকারী, অসামাজিক ও পিতা মাতার অবাধ্য ছেলের অঢেল সম্পদ দেখে মেয়ে বিয়ে দেওয়া মানে মেয়েকে জলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা। যোগ্যতা, মননশীলতা, সততা মানুষের জীবনের মূল সম্পদ। পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, ছেলে কর্মঠ কিনা? হোক সে দিনমজুর, হোক সে রিক্সাচালক, হোক সে ফেরিওয়ালা। সৎ উপার্জনে দুইমুঠো ভাত জোগাড় করতে পারছে কিনা? পরিবার তথা স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে পারছে কিনা? তা দেখার বিষয়। ধনীরা টাকার নেশায় শান্তিতে ঘুমাতে পারে না; তাঁরা অস্থিরতায় দিন-রাত কাটায়। কিন্তু একজন মুচি নুনে ভাতে দুমুঠো খেয়ে স্ত্রী সন্তানসন্ততি ও পরিবার নিয়ে শান্তিতে ঘুমায়। ইসলামী শরীয়াহ মতে,বিয়ের কুফু বা উপযুক্ত হওয়ার জন্য বর নির্বাচনে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাহলো- ধর্ম তথা দ্বীনদারি (স্বভাব-চরিত্র, আদব-আখলাক), স্বাধীন (পরাধীন নয়), বংশ মর্যাদা, পেশা। এ সমস্ত বিষয়াদি কে অবহেলা করা যাবে না। কারণ টাকায় সুখ নেই। যেমন মার্কিন লেখিকা গ্রেটচেন রুবিন তাঁর ‘দ্য হ্যাপিনেস প্রজেক্ট’ বইতে লিখেছেন, “অর্থ সুখ কিনতে পারে না। তবে অর্থ ব্যয় করে আপনি যে অসংখ্য জিনিস কেনেন, তা আপনার সুখের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।” মূলত যৌতুক হিন্দু ধর্মের প্রথা। বর্তমানে তা বিভিন্ন ধর্মের বিবাহ প্রক্রিয়ায় শিখর গজাতে শুরু করেছে। যৌতুক প্রথা বর্তমানে আধুনিকতায় রূপ নিয়েছে। জীবনধ্বংসী এ কুপ্রথা মানুষ কে নিঃস্ব করে পথে বসিয়েছে। সমাজ কে এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে অন্যথায় আগামীর দিন গুলো হবে আমাদের জন্য নরকের স্ফুলিঙ্গের মত। অর্থ-সম্পদ কিংবা অধিক মোহর দেয়ার সক্ষমতা কোনো বরের উপযুক্তগুণ নয় এবং কনের জন্য নিরাপদ ও উত্তম বরের বৈশিষ্ট্য ও নয়। উত্তম বরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দ্বীনদারিতা, সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতা। আসুন আমরা কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ি। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ি। এটাই হোক তারুণ্যের স্লোগান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

আরো লেখাসমূহ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায় ইয়োলো হোস্ট